ক্রমবর্ধমান জলবায়ু দূষণের বড় একটি উৎস সামুদ্রিক বাণিজ্য। এ ধরনের পরিবহনে যুক্ত জাহাজ থেকে নিঃসৃত কার্বন ডাই-অক্সাইডের ক্ষতিপূরণ নিয়ে অনেক দিন ধরে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হয়ে আসছে। এবার ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) বৈঠকে প্রথমবারের মতো জাহাজ থেকে উৎপন্ন কার্বন ডাই-অক্সাইডের জন্য অর্থ নেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এ অর্থ পরিশোধ করবে শিপিং কোম্পানিগুলো। তবে এ সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে কার্বন কর পরিশোধ নিয়ে দীর্ঘদিন চলে আসা আলোচনার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ পর্যবেক্ষকদের। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বলছে, গৃহীত এ পদক্ষেপ দরিদ্র দেশগুলোর প্রত্যাশিত কার্বন কর থেকে অনেকটাই দুর্বল। দেশগুলো কার্বন কর থেকে জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় তহবিল সংগ্রহ করতে চেয়েছিল।
লন্ডনের এ বৈঠকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), রাশিয়াসহ কয়েকটি পেট্রোলিয়ামনির্ভর দেশ নতুন নিয়মের বিরোধিতা করে। তবে বেশির ভাগ অংশগ্রহণকারী এ আপস প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এ প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৮ সাল থেকে সব জাহাজ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের জন্য অর্থ দেবে।
প্রস্তাব অনুসারে, গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের ভিত্তিতে জাহাজগুলোকে নির্দিষ্ট চার্জ দিতে হবে, যা নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে। পাশাপাশি শিপিং কোম্পানিগুলো নিজেদের মধ্যে কার্বন ক্রেডিট বাণিজ্য করতে পারবে। আশা করা হচ্ছে, সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন হলে কার্বন ডাই-অক্সাইডনির্ভর জ্বালানির কম ব্যবহার ও দক্ষভাবে পরিচালনার জন্য জাহাজ মালিকরা উৎসাহিত হবেন।
এতে বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি ডলার আদায় হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমও, যা প্রত্যাশিত ৬ হাজার কোটি ডলারের কার্বন করের তুলনায় অনেক কম। শিপিং শিল্পে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি চালু করার জন্য এ অর্থ ব্যবহার হতে পারে। অর্থাৎ আগে দেয়া প্রস্তাবে কার্বন কর আদায়ের মাধ্যমে জলবায়ু বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশে সহায়তার কথা উল্লেখ থাকলেও তা হচ্ছে না।
শিপিং খাতের পরামর্শক সংস্থা ইউমাস বলছে, এ ব্যবস্থায় প্রাথমিকভাবে সীমিত পরিসরে কার্বন নিঃসরণ কমবে। ২০৩০ সাল নাগাদ প্রায় ৮ শতাংশ নিঃসরণ কমবে, যা ২০২৩ সালে আইএমও ঘোষিত লক্ষ্য ২০ শতাংশ হ্রাসের তুলনায় অনেক কম।
ক্যাম্পেইন গ্রুপ অপরচুনিটি গ্রিনের সিনিয়র পরিচালক এমা ফেনটনের মতে, আইএমওর এ সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক। কিন্তু দুই বছর আগে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে তারা ব্যর্থ।
নতুন নিয়ম অনুসারে, জাহাজ মালিকরা ভারী ও দূষণকারী জ্বালানির বিকল্প হিসেবে এলএনজি বেছে নিতে পারেন। তবে আগামী দশকে নিয়ম আরো কঠোর হবে এবং তখন এলএনজির ব্যবহার শাস্তিযোগ্য হবে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের এনার্জি অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ট্রিস্টান স্মিথের মতে, নতুন নিয়ম বায়োফুয়েলের ব্যবহারকে উৎসাহ দেবে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। প্রথম পাঁচ বছরে ৮৫ শতাংশ জাহাজে কম খরচের বিকল্প হতে পারে এ জ্বালানি। এতে কয়েক কোটি টন বায়োফুয়েলের চাহিদা তৈরি হবে।
গ্রিন হাইড্রোজেন অর্গানাইজেশনের প্রধান নির্বাহী জোনাস মোবার্গ বলেন, ‘আইএমওর সিদ্ধান্ত গ্রিন ফুয়েল কোম্পানিগুলোকে প্রকল্প এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছে। এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে, গ্রিন অ্যামোনিয়ার মতো শূন্য নিঃসরণ জ্বালানি ভবিষ্যতে শিপিং খাতে আরো বড় ভূমিকা পালন করবে।’
অনেক ছোট দ্বীপরাষ্ট্র হতাশা প্রকাশ করে চূড়ান্ত ভোটে অংশ নেয়নি। টুভ্যালুর পরিবহন ও জ্বালানিমন্ত্রী সাইমন কোফ জানান, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে স্পষ্ট সমাধান আশা করে বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু বড় অর্থনীতিগুলোর প্রস্তাবিত দুর্বল বিকল্প প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার লক্ষ্যে পৌঁছতে দেবে না। তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের কমে সন্তুষ্ট হতে বলেছে, অথচ ক্ষতিটা আমাদেরই বেশি হচ্ছে।’
আইএমও ঘোষিত নিয়মগুলো এখনো পরিমার্জনের জন্য উন্মুক্ত। আগামী অক্টোবরে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হওয়ার আগে পরিবর্তন হতে পারে।
মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের জলবায়ুবান্ধব শিপিং বিষয়ক বিশেষ দূত আলবন ইশোডা বলেন, ‘আমরা এখানেই থামব না, আবার ফিরব। ক্যারিবিয়ান, প্রশান্ত মহাসাগর, আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যের বন্ধুদের সঙ্গে আমরা এখনো দাবি নিয়ে আছি।’
যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় অংশ নিলেও একপর্যায়ে তা থেকে সরে দাঁড়ায়। সেখানে এক বার্তায় প্রস্তাবিত কার্বন করের বিরোধিতা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৈঠকে অংশ নেয়া উন্নত দেশের এক অংশগ্রহণকারী জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কার্বন করের পক্ষে থাকলেও আলোচনা শুরুর আগেই তারা কার্বন ট্রেডিং সমর্থনে পক্ষ বদল করে।
চীন, ব্রাজিল ও আরো কিছু উদীয়মান অর্থনীতি কার্বন করের বিরোধিতা করলেও কার্বন ট্রেডিংয়ের আপসের পক্ষে ভোট দিয়েছে।
ভানুয়াতুর পরিবেশমন্ত্রী রালফ রেগেনভানু জানান, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর মিত্র দেশগুলো আলোচনার অগ্রগতি আটকে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘তারা এমন একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, যা আমাদের মতো জলবায়ু দুর্যোগে থাকা দেশের জন্য নির্ভরযোগ্য অর্থায়নের উৎস হতে পারত।’